বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। ১৯৭১ সালের তিনি কারো লেখা স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেননি।  তিনি নিজেই স্বাধীনতার ঘোষণা লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিপ্লবী সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের ঘোষনা এখন ইতিহাস বিকৃতিকারীদের কবলে পড়েছে। তবে শক্তি দিয়ে কিংবা চক্রান্ত করে সত্যকে চাপিয়ে রাখা যায়না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, গবেষণা চলছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনেক বই লেখা হয়েছে। এসব বই এবং সেসময়কার গনমাধ্যমে স্পষ্টভাবেই উল্লেখ রয়েছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার কথা। এবার কিছু তথ্য প্রমান দেখে নেয়া যাক।

২৬ একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়াউর রহমান এক অবিস্মরণীয় নাম। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল ২৫ মার্চ রাতেই। আর ওই ২৫ মার্চ গত মধ্যরাতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া। শুধু বিদ্রোহ ঘোষণাই করেননি, নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণাটিও পাঠ করেছিলেন। সেই দুঃসময়ে বাঙালি জাতি ছিল দিশেহারা, দিকনির্দেশনাহীন। ঠিক এ সময়ে মেজর জিয়ার ú্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠের ঘোষণা ছিলো তুর্যধ্বনির মতো। প্রথম ঘোষণায় তিনি নিজেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। তার এ ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ভারতের ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দলিলেও এটি রয়েছে।

প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের রাজনৈতিক সচিব মঈদুল হাসান তরফদার লিখেন, “২৭ শে মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষনা করেন। মেজর জিয়া তাঁর প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ’রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসাবে ঘোষনা করলেও, পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পরামর্শক্রমে তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।” (মূলধারা:৭১, পৃষ্ঠা ৫)। এখানে উলেখযোগ্য যে, মেজর জিয়া শেখ মুজিবের নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা কথা বললেও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে আগেকার ঘোষনা সংশোধন করেননি।

মেজর রফিক-উল ইসলাম বীরউত্তম, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) তার লেখা অ ঞধষব ড়ভ সরষষরড়হং  গ্রন্থের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ২৭ মার্চের বিকেলে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন। পরে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কেন তিনি মত পরিবর্তন করেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মেজর রফিক-উল ইসলাম। একজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা দিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র (চড়ষরঃরপধষ ঈযধৎধপঃবৎ ড়ভ ঃযব গড়াবসবহঃ) ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য এই গণ-অভ্যুত্থান সামরিক অভ্যুত্থান রূপে চিত্রিত হতে পারে, এই ভাবনায় মেজর জিয়া পুনরায় দেন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। এই ঘোষণা শোনা যায় ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত (জধভরয়-ঁষ-ওংষধস, অ ঞধষব ড়ভ সরষষরড়হং, উযধশধ. ইইও, ১৯৮১)।

৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহ, বীরউত্তম, তাঁর ইধহমষধফবংয ধঃ ডধৎ (উযধশধ অপধফবসু চঁনষরংযবুৎং, ১৯৮৯) গ্রন্থে , ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন : মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তÍান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান রূপে ঘোষণা করেন।

মেজর কে এম সফিউল্লাহ আরো লিখেন, জিয়াউর রহমান তার ঘোষনায় আরো বলেন, “আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরবো না, বরং বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তান রূপে (স্বাধীনতার জন্যে) প্রাণ দেব। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তÍান রাইফেলস এবং সমগ্র পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোহর, বরিশাল, খুলনায় অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। মেজর সফিউল্লাহর মতে, এই ঘোষণা দেশে এবং বিদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করে। যারা ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধে রত ছিলেন এই ঘোষণা তাদের নৈতিক বল ও সাহসকে বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়। অন্যরাও এই যুদ্ধে শামিল হন।

মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া লিখেছেন, জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আরেকটি ঘোষণা দেন যে, এই শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে। এছাড়াও ড. আজিজুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম এবং অন্য আরো অনেকেই তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, জিয়া প্রথম দিনের ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।কর্নেল অলি আহমদ, বীরবিক্রম, অক্সফোর্ড বুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থে-রাষ্ট্র বিপ্লব : সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৮) বলেছেন, মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (মুখবন্ধ)। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার সময় তিনি মেজর জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন।

জিয়া একাত্তরের ২৬ মার্চ সন্ধ্যা ৭:৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গররত অবস্থায় একটি জাপানী জাহাজ থেকে অষ্ট্রেলিয়া রেডিওতে জিয়ার ঘোষণার বার্তাটি পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া রেডিও জিয়ার ঘোষণাটি প্রথম প্রচার করে। এরপর বিবিসি’তে প্রচারিত হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থে দেয়া সাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বলেন,  মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতারকেন্দ্রে এসে প্রথম যে ঘোষণাটি দিলেন, সে ঘোষণায় তিনি নিজেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

স্বাধীন বাংলা বেতারের একজন শব্দ সৈনিক বেলাল মোহাম্মদ। সেই সন্ধ্যার ঘটনা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘জিয়াউর রহমান যে খসড়াটি তৈরি করেছিলেন তাতে তিনি নিজেকে প্রভিশনাল হেড অব বাংলাদেশ বলে উল্লেখ করেছিলেন। খসড়াটি নিয়ে তার সঙ্গী ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে আলোচনার সময় আমিও উপস্থিত ছিলাম।  মেজর জিয়াউর রহমান আমার মতামতও চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, ক্যান্টনমেন্টের বাইরে আপনার মতো আর কেউ আছে কিনা মানে সিনিয়র অফিসার তা জানার উপায় নেই। বিদেশের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার জন্য আপনি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সামরিক বাহিনীর প্রধান অবশ্যই বলতে পারেন। ঘোষণাটি প্রচারের সময় ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে’ শব্দগুলো উল্লেখ করা হয়নি। বেলাল মোহাম্মদ আরো লিখেছেন, একটি এক্সারসাইজ খাতার পাতায় জিয়াউর রহমান এই ভাষণটি লিখেছিলেন।তবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের ওই ঘোষনাটি এখন ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। দেখে নেয়া যাক কি ছিলো ঘোষনাটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *